ভিডিও গ্যালারী

২৫ বছর আগে ফিরে গেলেন আমিনুল

‘কী বলেন ভাই, ২৫ বছর হয়ে গেল!’ ফোনের অপর প্রান্তে আমিনুল ইসলামের কণ্ঠে অবিশ্বাস। তাঁর শুরুর সময়টা থেকে যে ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে, সেটা যেন বিশ্বাসই হতে চাইছে না বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়কের।
আজ ২৭ অক্টোবর। আজ থেকে ২৫ বছর আগে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। এ দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আজ রজতজয়ন্তী। ১৯৮৮ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে উইলস এশিয়া কাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে যে পথচলার শুরু, আজ তার ২৫ বছর পূর্তি। পুরো বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে দেশের পক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানও দারুণ স্মৃতিকাতর। অস্ফুট স্বরে তাঁর মন্তব্য, ‘সময় কীভাবে যে চলে যায়!’ ২৫ বছর আগে এশিয়া কাপের উদ্বোধনী দিনেই দেশের হয়ে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল আমিনুল ইসলামের। প্রথম আলো ডটকমের পক্ষ থেকে সেই দিনটি সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পর তিনিও যেন হারিয়ে গেলেন স্মৃতির পৃষ্ঠায়। এত দিনের জমে পড়া ধুলো সরিয়ে মেলেও ধরলেন স্মৃতির সেই ডালি। বললেন, ‘আজ দেশের ক্রিকেট কোথায় চলে গেছে! এই সময়ে দাঁড়িয়ে ২৫ বছর আগের ওই দিনটির কথা ভাবতে খুব ভালো লাগছে। সত্যিই ক্রিকেটে অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি আমরা।’ স্মৃতিকাতর আমিনুলের কাছে ২৫ বছর আগের স্মৃতি যেন এখনো উজ্জ্বল, ‘জানেন, খুব উত্তেজিত ছিলাম আমরা ওই সময়। দেশের মাটিতে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলব, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দল আমাদের প্রতিপক্ষ। বিশ্বসেরা ক্রিকেটারদের নিজেদের মাঠে মোকাবিলা করব—সবকিছুই আমাদের কাছে ছিল স্বপ্ন পূরণ হওয়ার মতো। আমার উত্তেজনাটা ছিল আরও বেশি। অভিষেক হতে যাচ্ছে; আসলে ওই সময়ের অনুভূতিগুলো ঠিক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
আমিনুলকে সব সময় নাড়া দিয়ে যায় যে স্মৃতি, সেটাও ওই সময়কার, ‘মনে আছে ২৭ অক্টোবর এশিয়া কাপ শুরু হয়েছিল, তার আগের দিন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার শফিকুল হক হীরা ভাই আমাকে আর আকরামকে (আকরাম খান) জাতীয় দলের ক্যাপ দিলেন। ক্যাপ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আজ আমাদের কাছ থেকে নিলে, এবার আমাদেরকে কিছু দাও।”’ শফিকুল হক হীরার এই কথাটি আমিনুলকে আজও ছুঁয়ে যায়।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে অনেক কিছুই ছিল এ দেশের ক্রিকেটের জন্য নতুন ঘটনা। এশিয়া কাপের আগে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম (তখন ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম) আর চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে (তখন চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম) বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানের উইকেট। ওই সময় ভালো উইকেট তৈরির বিষয়টি জানার মতো লোকও এ দেশে বিশেষ কেউ ছিলেন না। পাকিস্তান থেকে কিউরেটর এনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তৈরি করা হয়েছিল উইকেট।
এশিয়া কাপেই প্রথমবারের মতো জাতীয় ক্রিকেট দল পেয়েছিল পৃষ্ঠপোষক। বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার’ সেদিন জাতীয় ক্রিকেট দলকে সরবরাহ করেছিল ক্রিকেটের সরঞ্জামাদি।একদিন এঁদের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে হাঁটি হাঁটি পা করে করে হাঁটতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ! ফাইল ছবি
নিজের অভিষেক ম্যাচটি আমিনুল খেলেছিলেন চট্টগ্রামে। সেটাও এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর স্মৃতি তাঁর কাছে, ‘ভারতের বিপক্ষে খেলাটা ছিল। ভারতীয় দলের বোলিং লাইনআপ তখন কপিল দেব, সঞ্জীব শর্মা, মনিন্দর সিং আর আরশাদ আইয়ুবের সমন্বয়ে গড়া। কপিল দেবের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। মনিন্দর সিং তখন ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা বাঁ হাতি স্পিনার। তাঁদেরকে প্রথমবারের মতো মোকাবিলা করে আমরা সবাই রোমাঞ্চিত ছিলাম।’ নির্ধারিত পুরো ৪৫ ওভার ব্যাট করে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল সর্বসাকল্যে ৯৯ রান। ৮ উইকেট হারিয়ে ওই ৯৯ রানই সেদিন দারুণ আনন্দ দিয়েছিল চট্টগ্রামের দর্শকদের। বাংলাদেশের প্রতিটি রানই বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনিতে স্বাগত জানিয়েছিলেন সবাই। আমিনুল নিজে সেদিন করেছিলেন ১০ রান। দুই অঙ্ক ছোঁয়া সংগ্রহে তাঁর ছিল একটি চারের মার। ব্যাপারটি মনে করিয়ে দিতে রসিকতা করলেন তিনি, ‘দশ রান করেই সেদিন আমি পরের ম্যাচে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছিলাম।’ সর্বোচ্চ ২২ রান এসেছিল মিনহাজুল আবেদীনের ব্যাট থেকে। আতহার আলী খান করেছিলেন ১৬ রান।
আজ ক্রিকেট যে পর্যায়ে এসেছে, ওই দিনের কথা ভাবলে অবাকই লাগে আমিনুলের, ‘সেদিন দর্শক আমাদের প্রতিটি রানকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। আজ তাঁরা জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না। আসলেই আমাদের ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। পথচলার শুরুটা আমরা করেছিলাম। ভাবতে ভালোই লাগে।’
আমিনুলের উত্তরসূরি সাকিবরাও একদিন সময়ের হাত ধরে ‘সাবেক’ হয়ে যাবেন। তাঁরাও এমন স্মৃতিচারণা করবেন ২০-২৫ বছর আগের কোনো ঘটনার। আমিনুলের প্রত্যাশা, সাকিবদের সেই স্মৃতিচারণায় যেন উঠে আসে, ‘২৫ বছর আগে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল, ভাবা যায়!’

সম্পর্কিত সংবাদ

No comments:

Leave a Reply