বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের দ্বিতীয় দিনেও দেশের
বিভিন্ন স্থানে হরতাল-সমর্থক, হরতালবিরোধী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আবদুল আলীম
নামে উপজেলা যুবদলের নেতা, চাঁদপুরে আরজু (১৪) নামের এক শিশু, চট্টগ্রামের
সাতকানিয়ায় পিকেটারের ঢিলে মো. ওয়াসিম (৩৫) নামের একজন ট্রাকচালক এবং
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে যুবদলের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে
চাঁদপুরে লোহারপুল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে, বরগুনা, মাগুরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, গুলিবিনিময়, গাড়ি ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নোয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২৭ জন।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:মির্জাপুর: পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, হরতালের সমর্থনে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সদস্য ফিরোজ হায়দার খানের সমর্থক ও গোড়াই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম মিয়ার সমর্থকদের মিছিলে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আবদুল আলীমসহ উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। মুমূর্ষু অবস্থায় আলীমকে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান। আবদুল আলীম উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক।
এদিকে আবদুল আলীমের মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পক্ষের লোকজন শাহ আলমের সমর্থক হিসেবে পরিচিত মন্টু মিয়ার বাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।
মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর ইসলাম বলেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
চাঁদপুর: শহরের পুরান বাজারের লোহারপুল এলাকায় সকাল পৌনে নয়টার দিক থেকে হরতালকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে হরতালকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ২০-২৫টি ককটেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রায় ৩০টি কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবারের গুলি ছোড়ে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়। এরপর দফায় দফায় হরতালকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় মো. আরজু (১৪) নামের এক শিশু গুরুতর আহত হয়। পরে তাঁকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সদর হাসপাতালের চিকিত্সক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আরজুকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখনই সে মৃত ছিল। তার শরীরে রাবার বুলেট লেগেছিল। এ ছাড়া হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাকিম আলী (২২) নামের এক যুবক চিকিত্সাধীন।
আরজুর বাবা মকুবল হোসেন জানান, আরজু লোহারপুল এলাকায় সুতার কারখানায় কাজ করত। সকালে গোসল করতে গিয়ে সে আর ফিরে আসেনি। বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে চলে যায়।
অন্যদিকে বিএনপির জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ দাবি করেন, আরজু ছাত্রদলের কর্মী ছিল। এদিকে এ পরিস্থিতিতে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
এ ছাড়া পিকেটিংকালে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে বলে জেলা পুলিশ সুপার আমির জাফর জানিয়েছেন।
সাতকানিয়া: চট্টগ্রাম থেকে গতকাল রোববার রাতে মালামাল নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে সাতকানিয়ায় পিকেটারদের ঢিলে মো. ওয়াসিম নামের একজন ট্রাকচালক নিহত হয়েছেন। আহত হন চালকের দুই সহকারী। নিহত চালকের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। আহত দুজন হলেন কক্সবাজারের উখিয়ার মোহাম্মদ আলম ও মোহাম্মদ হোসেন।
আহত মোহাম্মদ আলম পুলিশকে জানান, গতকাল রাতে ট্রাকে মাল নিয়ে তাঁরা তিনজন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে সাতকানিয়ায় হাসমতের দোকানের দক্ষিণ পাশে ১০-১২ জন পিকেটার ইট ছোড়ে। এতে ট্রাকচালক ওয়াসিমের চোখে আঘাত লাগে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলে চালকের মৃত্যু হয়। তাঁরা দুই সহকারী ঢিলের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান সরকার বলেন, ট্রাকচালকের লাশ হাইওয়ে পুলিশের কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
নোয়াখালী: বেলা ১১টার দিকে জেলার চাটখিল উপজেলা সদরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৮ দলের সাতজন কর্মী-সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান নামের একজন শিবির-কর্মীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁকে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ অপর ছয়জনকে স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।
চাটখিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মজিদ গুলিতে কয়েকজন আহত হওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘গুলি তো তারাও করেছে, কার গুলিতে আহত হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: সদর থানার ওসি এস এম বজলুর রশীদ জানান, হরতালের সমর্থনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে মিছিল বের করে ১৮ দল। মিছিলের পর বাতেন খাঁর মোড়ে সমাবেশ করে ফেরার পথে নিমতলা এলাকায় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকবাল মাহমুদ খান খান্নার বাড়িতে হামলা চালায় হরতাল-সমর্থকরা। একপর্যায়ে তাঁরা পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে। এ ছাড়া শহীদ সাটু হলের সামনে জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক দুলহান উদ্দীন দুলালের ওপর হামলা চালানো হয়।
রাজশাহী: পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মহানগর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সকালে দড়িখরবোনা এলাকায় পিকেটিং করে দুটি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাবারের গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। জবাবে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে পিকেটাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে জেলা বিএনপি রাজশাহী কলেজের সামনে সমাবেশ করার সময় ছাত্রদলের কর্মীরা তিনটি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন। পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বাঘা থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, বাঘায় সকালে দুটি চায়ের দোকান ও একটি পানের দোকান থেকে ছয়টি হাতবোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। হরতালের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য কেউ এটা করে থাকতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ: সিদ্ধিরগঞ্জে সকাল সাড়ে আটটার দিকে হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা কাঠের গুঁড়িতে আগুন দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-ডেমরা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ছাড়া শহরের দ্বিগু বাবু এলাকায় মহানগর যুবদল মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। এতে মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তার হোসেন খোকন শাহসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। কালীরবাজার এলাকায় মিছিল ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির।
অন্যদিকে ফতুল্লার পাগলায় সড়কে যুবদলের কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল, চার-পাঁচটি যানবাহন ভাঙচুর ও ১০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। পুলিশ গিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পাথরঘাটা (বরগুনা): বরগুনার পাথরঘাটায় কাকতিরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিএনপির হরতাল-সমর্থকদের মিছিল থেকে হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিল এবং বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙচুর করা হয়।
হামলায় ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল পাহলান, যুবলীগের সদস্য টিপু আকন্দ ও নান্না হাওলাদার আহত হন। কাকতিরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফুয়াদ হোসেনের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন হামলায় অংশ নেন।
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ): হরতালের সমর্থনে সকাল পৌনে নয়টার দিকে পৌর বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি মিছিল সিনেমা হল সড়কের দিকে আসে। ওই সময় একই সড়ক দিয়ে আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিল যাচ্ছিল। এ সময় দুই পক্ষ মুুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই দলের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৫০টি রাবার বুলেট ছোড়ে। পুলিশের বাধার মুখে ৩০ মিনিটের মধ্যে হরতালের পক্ষ ও বিপক্ষের সমর্থকেরা সিলেমা হল সড়ক থেকে সরে যায়। সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের সাতজন ও বিএনপির দুজন কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিত্সা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
মাগুরা: দুপুর ১২টার দিকে শহরের মাগুরা দুধ মল্লিক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে দুটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। এদিকে বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষা চলাকালীন বিস্ফোরণের এই বিকট শব্দে বর্ণালী নামের এক শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে যায়। তাকে মোল্লাপাড়ায় তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাদারগঞ্জ (জামালপুর): হরতালের সমর্থনে সকালে জামায়াতের ২০-৩০ জনের একটি দল উপজেলার বালিজুড়ী এফ এম উচ্চবিদ্যালয়ের মোড়ে মিছিল করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির আমিনুর রহমানকে আটক করেছে। অন্যরা পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শত শত নেতা-কর্মী রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন। মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে লাঠি হাতে তাঁরা হরতালবিরোধী মিছিল করছেন।
খুলনা: সকাল আটটার দিকে শিবিরের কর্মীরা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মিছিল বের করেন। তাঁরা রাস্তায় পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন এবং ১৫টি ককটের বিস্ফোরণ ঘটান। এ সময় তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের একটি পিকাপভ্যান ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ ও শিবিরের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। সংঘর্ষে সোনাডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সালাউদ্দিন আহত হন। এর পর শিবিরের কর্মীরা ১৭ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৫টি রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের চারটি শেল নিক্ষেপ করে।
পটুয়াখালী: হরতালের সমর্থনে জেলা বিএনপি বেলা ১১টার দিকে শহরের সার্কিট হাউস এলাকার বটতলায় সমাবেশ করেছে। একই সঙ্গে জেলা যুবলীগের উদ্যোগে শহরে হরতালের বিপক্ষে মিছিল হয়েছে। সকাল থেকে থেমে থেমে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পুলিশ গতকাল রোববার গভীর রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে মোট ৩৬ জনকে আটক করেছে।
সিরাজগঞ্জ: সকাল ১০টা ও সোয়া ১০টার দিকে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামের সরকারি বাসভবনের সামনে ও চালা আদালতপাড়ায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বেলকুচি থানার ওসি আবদুল হাই জানান, ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরিত ককটেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ: কোতোয়ালি থানার ওসি গোলাম সারওয়ার জানান, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ১৬ নেতা-কর্মীকে আজ ভোরে আটক করেছে পুলিশ ও র্যাব। তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের মামলা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে, বরগুনা, মাগুরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, গুলিবিনিময়, গাড়ি ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নোয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২৭ জন।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:মির্জাপুর: পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, হরতালের সমর্থনে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সদস্য ফিরোজ হায়দার খানের সমর্থক ও গোড়াই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম মিয়ার সমর্থকদের মিছিলে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আবদুল আলীমসহ উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। মুমূর্ষু অবস্থায় আলীমকে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান। আবদুল আলীম উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক।
এদিকে আবদুল আলীমের মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পক্ষের লোকজন শাহ আলমের সমর্থক হিসেবে পরিচিত মন্টু মিয়ার বাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।
মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর ইসলাম বলেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
চাঁদপুর: শহরের পুরান বাজারের লোহারপুল এলাকায় সকাল পৌনে নয়টার দিক থেকে হরতালকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে হরতালকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ২০-২৫টি ককটেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রায় ৩০টি কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবারের গুলি ছোড়ে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়। এরপর দফায় দফায় হরতালকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় মো. আরজু (১৪) নামের এক শিশু গুরুতর আহত হয়। পরে তাঁকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সদর হাসপাতালের চিকিত্সক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আরজুকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখনই সে মৃত ছিল। তার শরীরে রাবার বুলেট লেগেছিল। এ ছাড়া হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাকিম আলী (২২) নামের এক যুবক চিকিত্সাধীন।
আরজুর বাবা মকুবল হোসেন জানান, আরজু লোহারপুল এলাকায় সুতার কারখানায় কাজ করত। সকালে গোসল করতে গিয়ে সে আর ফিরে আসেনি। বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে চলে যায়।
অন্যদিকে বিএনপির জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ দাবি করেন, আরজু ছাত্রদলের কর্মী ছিল। এদিকে এ পরিস্থিতিতে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
এ ছাড়া পিকেটিংকালে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে বলে জেলা পুলিশ সুপার আমির জাফর জানিয়েছেন।
সাতকানিয়া: চট্টগ্রাম থেকে গতকাল রোববার রাতে মালামাল নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে সাতকানিয়ায় পিকেটারদের ঢিলে মো. ওয়াসিম নামের একজন ট্রাকচালক নিহত হয়েছেন। আহত হন চালকের দুই সহকারী। নিহত চালকের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। আহত দুজন হলেন কক্সবাজারের উখিয়ার মোহাম্মদ আলম ও মোহাম্মদ হোসেন।
আহত মোহাম্মদ আলম পুলিশকে জানান, গতকাল রাতে ট্রাকে মাল নিয়ে তাঁরা তিনজন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে সাতকানিয়ায় হাসমতের দোকানের দক্ষিণ পাশে ১০-১২ জন পিকেটার ইট ছোড়ে। এতে ট্রাকচালক ওয়াসিমের চোখে আঘাত লাগে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলে চালকের মৃত্যু হয়। তাঁরা দুই সহকারী ঢিলের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান সরকার বলেন, ট্রাকচালকের লাশ হাইওয়ে পুলিশের কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
নোয়াখালী: বেলা ১১টার দিকে জেলার চাটখিল উপজেলা সদরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৮ দলের সাতজন কর্মী-সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান নামের একজন শিবির-কর্মীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁকে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ অপর ছয়জনকে স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।
চাটখিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মজিদ গুলিতে কয়েকজন আহত হওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘গুলি তো তারাও করেছে, কার গুলিতে আহত হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: সদর থানার ওসি এস এম বজলুর রশীদ জানান, হরতালের সমর্থনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে মিছিল বের করে ১৮ দল। মিছিলের পর বাতেন খাঁর মোড়ে সমাবেশ করে ফেরার পথে নিমতলা এলাকায় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকবাল মাহমুদ খান খান্নার বাড়িতে হামলা চালায় হরতাল-সমর্থকরা। একপর্যায়ে তাঁরা পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে। এ ছাড়া শহীদ সাটু হলের সামনে জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক দুলহান উদ্দীন দুলালের ওপর হামলা চালানো হয়।
রাজশাহী: পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মহানগর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সকালে দড়িখরবোনা এলাকায় পিকেটিং করে দুটি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাবারের গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। জবাবে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে পিকেটাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে জেলা বিএনপি রাজশাহী কলেজের সামনে সমাবেশ করার সময় ছাত্রদলের কর্মীরা তিনটি অটোরিকশা ভাঙচুর করেন। পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বাঘা থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, বাঘায় সকালে দুটি চায়ের দোকান ও একটি পানের দোকান থেকে ছয়টি হাতবোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। হরতালের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য কেউ এটা করে থাকতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ: সিদ্ধিরগঞ্জে সকাল সাড়ে আটটার দিকে হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা কাঠের গুঁড়িতে আগুন দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-ডেমরা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ছাড়া শহরের দ্বিগু বাবু এলাকায় মহানগর যুবদল মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। এতে মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তার হোসেন খোকন শাহসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। কালীরবাজার এলাকায় মিছিল ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির।
অন্যদিকে ফতুল্লার পাগলায় সড়কে যুবদলের কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল, চার-পাঁচটি যানবাহন ভাঙচুর ও ১০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। পুলিশ গিয়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পাথরঘাটা (বরগুনা): বরগুনার পাথরঘাটায় কাকতিরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিএনপির হরতাল-সমর্থকদের মিছিল থেকে হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিল এবং বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙচুর করা হয়।
হামলায় ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল পাহলান, যুবলীগের সদস্য টিপু আকন্দ ও নান্না হাওলাদার আহত হন। কাকতিরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফুয়াদ হোসেনের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন হামলায় অংশ নেন।
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ): হরতালের সমর্থনে সকাল পৌনে নয়টার দিকে পৌর বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি মিছিল সিনেমা হল সড়কের দিকে আসে। ওই সময় একই সড়ক দিয়ে আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিল যাচ্ছিল। এ সময় দুই পক্ষ মুুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই দলের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৫০টি রাবার বুলেট ছোড়ে। পুলিশের বাধার মুখে ৩০ মিনিটের মধ্যে হরতালের পক্ষ ও বিপক্ষের সমর্থকেরা সিলেমা হল সড়ক থেকে সরে যায়। সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের সাতজন ও বিএনপির দুজন কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিত্সা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
মাগুরা: দুপুর ১২টার দিকে শহরের মাগুরা দুধ মল্লিক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে দুটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। এদিকে বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষা চলাকালীন বিস্ফোরণের এই বিকট শব্দে বর্ণালী নামের এক শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে যায়। তাকে মোল্লাপাড়ায় তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাদারগঞ্জ (জামালপুর): হরতালের সমর্থনে সকালে জামায়াতের ২০-৩০ জনের একটি দল উপজেলার বালিজুড়ী এফ এম উচ্চবিদ্যালয়ের মোড়ে মিছিল করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির আমিনুর রহমানকে আটক করেছে। অন্যরা পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শত শত নেতা-কর্মী রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন। মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে লাঠি হাতে তাঁরা হরতালবিরোধী মিছিল করছেন।
খুলনা: সকাল আটটার দিকে শিবিরের কর্মীরা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মিছিল বের করেন। তাঁরা রাস্তায় পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন এবং ১৫টি ককটের বিস্ফোরণ ঘটান। এ সময় তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের একটি পিকাপভ্যান ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ ও শিবিরের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। সংঘর্ষে সোনাডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সালাউদ্দিন আহত হন। এর পর শিবিরের কর্মীরা ১৭ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৫টি রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের চারটি শেল নিক্ষেপ করে।
পটুয়াখালী: হরতালের সমর্থনে জেলা বিএনপি বেলা ১১টার দিকে শহরের সার্কিট হাউস এলাকার বটতলায় সমাবেশ করেছে। একই সঙ্গে জেলা যুবলীগের উদ্যোগে শহরে হরতালের বিপক্ষে মিছিল হয়েছে। সকাল থেকে থেমে থেমে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পুলিশ গতকাল রোববার গভীর রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে মোট ৩৬ জনকে আটক করেছে।
সিরাজগঞ্জ: সকাল ১০টা ও সোয়া ১০টার দিকে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামের সরকারি বাসভবনের সামনে ও চালা আদালতপাড়ায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বেলকুচি থানার ওসি আবদুল হাই জানান, ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরিত ককটেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ: কোতোয়ালি থানার ওসি গোলাম সারওয়ার জানান, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ১৬ নেতা-কর্মীকে আজ ভোরে আটক করেছে পুলিশ ও র্যাব। তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের মামলা রয়েছে।


No comments: